আমেরিকার রাজনীতিতে বড়সড় ধাক্কা খেলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পিছনে ফেলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিল ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সেনেট, দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার পথে বিরোধী শিবির। এই ফল চূড়ান্ত হলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির বাকি দু’বছর যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে প্রশাসনের একাধিক সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তের পথও খুলে যাবে।
৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার, ৪ নভেম্বর ফলের প্রাথমিক চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনবিসি নিউজের হিসাব বলছে, ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ২৫৫টি আসন পেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। আগের তুলনায় ৪০টিরও বেশি আসন বাড়তে পারে তাদের। এই ফল নিশ্চিত হলে প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম সেরা সাফল্য হতে পারে। দলের নেতা হাকিম জেফরিসের স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনাও জোরাল হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক রাজ্য থেকে। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস এবং আইওয়ার মতো জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাসে রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন জেমস টালারিকো। সাউথ ক্যারোলাইনায় ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। উত্তর ক্যারোলাইনায় জয় পেয়েছেন প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার। ওহায়োয় জন হাস্টেডকে হারিয়েছেন প্রাক্তন ডেমোক্র্যাট সেনেটর শেরড ব্রাউন। কানসাসেও রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন।
গভর্নর নির্বাচনেও একাধিক রাজ্যে ধাক্কা খেয়েছে রিপাবলিকান শিবির। টেক্সাসে গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে জিনা হিনোজোসার জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওহায়োয় বিবেক রামাস্বামীকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটন। আইওয়ায় জয় পেয়েছেন রব স্যান্ড। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমসের জয়ও নজর কেড়েছে।
কেন পিছিয়ে পড়ল ট্রাম্পের দল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভই ডেমোক্র্যাটদের জয়ের অন্যতম কারণ। এপি-র ভোটার সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট। প্রায় ৮০ শতাংশের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির জেরে তাঁদের পরিবার আর্থিক সমস্যায় পড়েছে। পাশাপাশি, ট্রাম্পের নীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে ঘিরেও ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একাধিক সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।
অন্যদিকে, সেনেটে মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি ও রাষ্ট্রদূতদের মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষমতা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধ, শুল্কনীতি এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়েও তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছে বিরোধী শিবির। যদিও নির্বাচনে দলের খারাপ ফলের দায় নিতে নারাজ ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তিনি নিজে ব্যালটে থাকলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হত। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার নির্বাচনের ফলের দিকে নজর রাখছে নয়াদিল্লিও। কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশনীতি সংক্রান্ত কমিটিগুলিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।

