‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’—এই প্রবাদকে সামনে রেখেই গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এবার নজিরবিহীন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। কলকাতা থেকে কপিলমুনি আশ্রম পর্যন্ত পুণ্যার্থীদের যাত্রাপথে একাধিক বিশেষ পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যাতায়াত, থাকা, খাওয়া থেকে শুরু করে পানীয় জল ও পুণ্যস্নান—সব ক্ষেত্রেই বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়ার ভাবনা রয়েছে নবান্নের। পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য প্রায় ২০ লক্ষ অত্যাধুনিক টেন্ট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা হবে এআই প্রযুক্তি ও সিসিটিভি। পাশাপাশি আকাশপথে হেলিকপ্টার এবং জলপথে রাজ্য ও সেনাবাহিনীর যৌথ নজরদারির ব্যবস্থাও থাকছে। তবে এবারের মেলায় আলাদা করে কোনও ভিআইপি পরিষেবা থাকবে না বলেই প্রাথমিক পরিকল্পনা।
গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যের কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মেলার পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রশাসন। নবান্নের পরিকল্পনা, রাজ্যে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই পুণ্যার্থীরা যাতে প্রয়োজনীয় পরিষেবা পান, তা নিশ্চিত করা। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালুর পাশাপাশি বাড়ানো হবে বাসের সংখ্যা। নদী পারাপারের জন্য অতিরিক্ত লঞ্চ নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে না হয় কাউকে। অন্যদিকে, ভারতীয় রেলের তরফে বিশেষ পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুণ্যার্থীদের বিনামূল্যে রেলযাত্রার বিষয়টিও বিবেচনা করছে রেল কর্তৃপক্ষ বলে খবর।
থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাতেও বড়সড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে তৈরি করা হবে অস্থায়ী শিবির ও টেন্ট। সেখানে বিনামূল্যে থাকার পাশাপাশি মিলবে পানীয় জল, স্নান ও আহারের সুবিধা। ভাণ্ডারায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশনেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুণ্যস্নানের সুবিধার্থে বাড়ানো হবে ঘাটের সংখ্যা। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য থাকবে পৃথক ব্যবস্থা। কপিলমুনি আশ্রমে পুজো দেওয়ার সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ পরিকল্পনা করছে প্রশাসন। মেলা প্রাঙ্গণে থাকবে আধুনিক অনুসন্ধান কেন্দ্র, সচিত্র পরিচয়পত্র এবং পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক। পাশাপাশি পুণ্যার্থীদের যেকোনও সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হবে সহায়তা কেন্দ্র।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিই হবে এবারের অন্যতম আকর্ষণ। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ যাত্রাপথ সিসিটিভি ও এআইয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি হেলিকপ্টার রাখার কথা ভাবা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আকাশপথের পাশাপাশি জলপথেও রাজ্য প্রশাসন ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে নজরদারি চালাবে। মেলা চলাকালীন ২৪ ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে শিফট অনুযায়ী কর্মীদের দায়িত্ব ভাগ করা হবে। বিশুদ্ধ পানীয় জল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিশ্চিত করতেও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পরিষেবা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতর ও সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি মেলার আয়োজন সফল করতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতার আশ্বাসও মিলেছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।
গঙ্গাসাগর মেলা বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হলেও যাতায়াত, থাকা, পানীয় জল, পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হয় পুণ্যার্থীদের। এবার সেই চেনা ছবিতে বদল আনতেই একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। সাধারণ পুণ্যার্থী থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তি—সকলের জন্য সমান পরিষেবা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। তবে কাগজে-কলমে তৈরি এই মহাপরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়িত হয়, পরিষেবার মান কতটা বজায় থাকে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়, তা বোঝা যাবে মেলা শুরু হলেই। আপাতত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লক্ষ্যে নবান্নের প্রস্তুতির দিকেই নজর।

