আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালিয়ে সাফল্য পেল ভারতীয় নৌসেনা। অপহৃত একটি ইরানি মাছ ধরার ট্রলার থেকে ২০ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। টানা ৪৮ ঘণ্টার এই অভিযানে ভারতীয় নৌসেনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল ভারতীয় বায়ুসেনাও। অভিযানের সাফল্যে নৌসেনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ।
গত সপ্তাহে সোমালিয়ার উপকূল থেকে ‘আজিনি’ নামে একটি ইরানি মাছ ধরার ট্রলার অপহরণ করে ১২ জনের জলদস্যু দল। গত রবিবার ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। সংবাদসংস্থা এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব সোমালিয়ার উপকূলবর্তী বায়লা ও হাফুন বন্দরের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে ট্রলারটি ছিনতাই করা হয়েছিল। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারে ২১ জন ইরানি নাবিক এবং সোমালিয়ার দু’জন নিরাপত্তারক্ষী-সহ মোট ২৩ জন ছিলেন। তবে অভিযান শেষে রাজনাথ সিংহ জানান, ২০ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
জলদস্যুদের উদ্দেশ্য ছিল, অপহৃত ট্রলারটিকে ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলিতে হামলা চালানো। ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার ইন্ডিয়ান ওশান’-এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটি ছিনতাইয়ের পর পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের দিকে এগোচ্ছিল জলদস্যুরা। এই সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক জলপথ নজরদারি সংস্থার তরফেও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল।
টানা ৪৮ ঘণ্টার অভিযানের খুঁটিনাটি এখনও প্রকাশ্যে আনেনি ভারতীয় নৌসেনা। তবে সমাজমাধ্যমে অভিযানের কয়েকটি ছবি পোস্ট করে নৌসেনার সাফল্যের প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। রাজনাথের বক্তব্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধে জাহাজ চলাচল বজায় রাখতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দ্রুত অপহৃত ট্রলারটিকে চিহ্নিত করা, তার গতিরোধ এবং বন্দি নাবিকদের উদ্ধারের জন্য নৌসেনার ভূমিকাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সোমালিয়ার জলদস্যুদের দাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে সোমালিয়া সরকারের তৎপরতায় জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে তারা। বিশেষ করে এডেন উপসাগর এবং পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। খবর, গত এপ্রিল থেকে অগস্টের মধ্যে অন্তত ছ’টি বাণিজ্যিক জাহাজ জলদস্যুদের কবলে পড়েছে।
সোমালিয়ার জলদস্যুদের হামলার ভয়াবহ পরিণতির সাক্ষী হয়েছে কলকাতাও। গত সেপ্টেম্বরে পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি অনার ২৫’-এ হামলা চালিয়ে পাঁচ নাবিককে হত্যা করে জলদস্যুরা। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার বাসিন্দা মোহম্মদ তানভীর উজ জমান। তাঁর সঙ্গে জাহাজে ছিলেন আরও ১৬ জন নাবিক। মোগাদিশুতে ১৮ হাজার ৫০০ ব্যারেল তেল পৌঁছে দেওয়ার পথে হামলার মুখে পড়ে জাহাজটি। তানভীর ছাড়াও মায়ানমারের এক এবং পাকিস্তানের তিন নাগরিক প্রাণ হারান। ঘটনায় আহত হন আরও এক ভারতীয় ও তিন পাকিস্তানি নাগরিক।
সব মিলিয়ে, আরব সাগরে ভারতীয় নৌসেনার এই অভিযান আন্তর্জাতিক জলপথে জলদস্যুদের বাড়বাড়ন্ত রুখতে ভারতের তৎপরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করল এই অভিযান।

