ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর ক্ষয়ক্ষতির রেশ এখনও কাটেনি। এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ফের ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা! নতুন করে তৈরি হওয়া একটি নিম্নচাপ ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর। ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে তার নাম হবে ‘মুরাসু’। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, শক্তি বাড়িয়ে এই ঘূর্ণিঝড় অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার সকালে স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেটির।
নতুন এই নিম্নচাপের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ, রায়ালসীমা এবং ওড়িশার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রবল ঝোড়ো হাওয়াও বইতে পারে। ইতিমধ্যেই উপকূলবর্তী জেলাগুলিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে চলতি বছরে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড় হবে ‘মুরাসু’। উল্লেখ্য, এই নামটি দিয়েছে ভারত।
আবহাওয়া দফতরের ডিরেক্টর জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছোনোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে আগের ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর তুলনায় ‘মুরাসু’-র তীব্রতা কম হতে পারে। কারণ, ‘অর্ণব’-এর সময় ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়েছিল।
কোন কোন এলাকায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা?
IMD-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২ ও ৩ নভেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশ এবং রায়ালসীমার বিভিন্ন এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে, ৩ ও ৪ নভেম্বর দক্ষিণ ওড়িশায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উপকূলবর্তী অন্ধ্রপ্রদেশ, ইয়ানাম এবং দক্ষিণ ভারতের সংলগ্ন এলাকাগুলিতেও নিম্নচাপের প্রভাব পড়তে পারে।
বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠার আশঙ্কায় মৎস্যজীবীদের জন্যও সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। আগামী বুধবার দুপুর পর্যন্ত সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যেই গভীর সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের দ্রুত উপকূলে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, পশ্চিম-মধ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্য বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সমুদ্র পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মাছ ধরার নৌকা এবং ছোট জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এখনও কাটেনি ‘অর্ণব’-এর ক্ষয়ক্ষতির রেশ
নতুন ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায়। কারণ, কয়েক দিন আগেই ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর দাপটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে। গত ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করেছিল ঘূর্ণিঝড়টি। ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার জেরে একাধিক এলাকায় বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উপড়ে পড়ে বহু গাছ। ব্যাহত হয় বিদ্যুৎ পরিষেবাও। এই দুর্যোগে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা মিলিয়ে ১ লক্ষ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের ক্ষত শুকোনোর আগেই ফের দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নভেম্বরে দেশে বৃষ্টির ঘাটতির পূর্বাভাস
পরপর দুটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও নভেম্বর মাসে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে IMD। দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারতে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ৭৭ শতাংশেরও কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্য, উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশ বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ এলাকাতেই বৃষ্টির ঘাটতি দেখা যেতে পারে।
পাশাপাশি দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে দিনের ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে হিমালয়ের পাদদেশ এবং মধ্য ও পূর্ব ভারতের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে। আবহাওয়া দফতরের ইঙ্গিত, শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল নিরপেক্ষ অবস্থায় থাকতে পারে।
এদিকে দিল্লি, পঞ্জাব-সহ উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে আপাতত শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। সেখানে তাপমাত্রার বিশেষ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। মূলত দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ অংশেই বৃষ্টির কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

