প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে। তবে সেই অধিকারের নামে দিনের পর দিন কোনও এলাকা বা জায়গা দখল করে রাখা যায় না। বিক্ষোভের জেরে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হলে তার দায়ও এড়ানো যায় না। মঙ্গলবার দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলন ঘিরে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রতিবাদ এবং ব্যবসা— দু’টিই নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনও জায়গা দখল করে বিক্ষোভ চালানো যেতে পারে না।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘প্রতিবাদ ও ব্যবসা করার অধিকার— দু’টোই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি অনির্দিষ্টকালের জন্য একটি জায়গা দখল করে রাখতে পারেন না। অন্য প্রতিবাদীরাও রয়েছেন। কৃষক, ব্যবসায়ী বা আইনজীবীরা কোথায় যাবেন? প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের আছে!’’ তাঁর পরামর্শ, গণপ্রতিবাদের জন্য এমন একটি নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা হোক, যেখানে আন্দোলনের কারণে কোনও ব্যবসায়ীর ক্ষতি হবে না।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী শিবির। এই দাবিতে পথে নেমেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-ও। দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় চলছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি। কিন্তু লাগাতার আন্দোলনের জেরে উৎসবের মরসুমে ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তাঁদের দাবি, বিক্ষোভের কারণে বেশ কিছু এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে ব্যবসায়ীদের পক্ষে আইনজীবী মুকুল রোহতগি বলেন, উৎসবের মরসুমে দিনের পর দিন দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিক্ষোভের কারণে দিল্লির কয়েকটি এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করেছে পুলিশ। তার জেরে সংশ্লিষ্ট এলাকার দোকানপাট বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, বিক্ষোভকারীদেরই নিজেদের কর্মসূচির দায়িত্ব নিতে হবে। শুনানিতে প্রশ্ন ওঠে, ব্যবসায় বিক্রি কমে যাওয়া বা আর্থিক ক্ষতির জন্য কি একমাত্র প্রতিবাদ কর্মসূচিকেই দায়ী করা যায়? জবাবে প্রধান বিচারপতি ফের মনে করিয়ে দেন, ব্যবসা এবং প্রতিবাদ— দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময়সীমা নির্দিষ্ট রাখার পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি। মুকুল রোহতগি আগামী দু’মাস কোনও প্রতিবাদ বা ধর্না না করার প্রস্তাবও দেন।
এদিকে, প্রথমে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি চেয়েছিল সিজেপি। কিন্তু সেখানে আন্দোলনের অনুমতি না দিয়ে বিকল্প হিসেবে তিনটি জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয় দিল্লি পুলিশ। কেন যন্তর মন্তরে অনুমতি দেওয়া হয়নি, শুনানিতে সেই প্রশ্নও ওঠে। জবাবে তুষার মেহতা জানান, গত ২০ জুলাই এক দিনের জন্য যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের অনুমতি দেওয়া হলেও সেই শর্ত মানা হয়নি। বরং বিক্ষোভকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অবস্থান চালিয়ে যান এবং জায়গাটি দখল করে রাখেন। এমনকি সংসদ অভিমুখে মিছিলও করা হয়েছিল। সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্য, সংসদ অন্য সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। যেমন সুপ্রিম কোর্ট অভিযান করা যায় না, তেমনই সংসদ অভিযানও করা যায় না।
উল্লেখ্য, একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও সরব হয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০২১ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)-এর বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগ আন্দোলন সংক্রান্ত মামলার শুনানিতেও শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও যেখানে-সেখানে, যখন খুশি আন্দোলন করা যায় না। এবার দিল্লির ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অভিযোগ ঘিরে ফের সেই অবস্থানই স্পষ্ট করল দেশের শীর্ষ আদালত।

